কৃষিতে প্রযুক্তি বিপ্লব: বাড়ছে উৎপাদন ও আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার

0
39
কৃষিতে প্রযুক্তি বিপ্লব বাড়ছে উৎপাদন ও আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে কৃষি ব্যবস্থা। বীজতলা থেকে উৎপাদন পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে রয়েছে প্রযুক্তি। যে লাঙল-জোয়াল আর ‘হালের বলদ’ ছিল কৃষকের চাষাবাদের প্রধান উপকরণ সে জায়গা এখন দখল করে নিয়েছে ‘আধুনিক লাঙল’ ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার, কম্বাইন্ড হার্ভেস্টার, ব্রডকাস্ট সিডার পাওয়ার রিপার মেশিন ইত্যাদি। কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে চাষাবাদের কারণে একদিকে যেমন সময়, শ্রম ও অর্থ সাশ্রয় হচ্ছে তেমনি ফসলের উৎপাদনও বেড়েছে। ফলে আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারে আগ্রহ বাড়ছে কৃষকের। কেবল জমি চাষই নয়, জমিতে নিড়ানি, সার দেয়া, কীটনাশক ছিটানো, ধান কাটা, মাড়াই, শুকানো ও ধান থেকে চাল সবই আধুনিক যন্ত্রের মাধ্যমে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট (বারি) ও বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইন্সটিটিউটের (ব্রি) হিসাবমতে, বর্তমানে দেশের মোট আবাদি জমির ৯০ থেকে ৯২ ভাগ চাষ হচ্ছে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে। যদি চাষাবাদের সব পর্যায়ে অর্থাৎ জমি তৈরি থেকে শুরু করে চাল উৎপাদন পর্যন্ত পুরোপুরি আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয় তাহলে রীতিমতো বিপ্লব ঘটবে কৃষিতে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর কৃষি মন্ত্রণালয়ের ‘খামার যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি-২য় পর্যায়’ প্রকল্পের আওতায় ৫১ জেলায় কৃষক পর্যায়ে আধুনিক যন্ত্রপাতি প্রদর্শনীর মাধ্যমে সেগুলো জনপ্রিয় করার চেষ্টা হচ্ছে। জমি চাষ থেকে ফসল মাড়াই- সমগ্র প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা হচ্ছে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি। এসব প্রযুক্তি সহজলভ্য ও জনপ্রিয় করতে এ প্রকল্পের মাধ্যমে ৫০ শতাংশ হারে ভর্তুকি দিচ্ছে সরকার। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে অক্টোবর পর্যন্ত সর্বমোট ৭ হাজার ৬৯৭ যন্ত্রপাতি বিতরণ করা হয়েছে। যদিও বর্তমানে সরকার হাওর অঞ্চলের জন্য কৃষিতে ভর্তুকির পরিমাণ বাড়িয়ে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ করেছে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে বিনামূল্যেও সরবরাহ করছে। সরকারি উদ্যোগে কৃষিতে ব্যাপকভাবে প্রযুক্তির ব্যবহারে সুফলও মিলছে। উৎপাদন বেড়েছে কয়েকগুণ। ধানের উৎপাদন বেড়েছে কয়েকগুণ। ধানের মতো গমের হেক্টরপ্রতি উৎপাদন বেড়েছে প্রায় তিনগুণ। আলু, ভুট্টারও হেক্টরপ্রতি উৎপাদন বেড়েছে। পেঁয়াজ, রসুন উৎপাদনেও এগিয়েছে বাংলাদেশ।
‘খামার যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি-২য় পর্যায় এর প্রকল্প পরিচালক শেখ মো. নাজিম উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে ১ থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকার শস্য অপচয় রোধ হবে। একইসঙ্গে প্রায় ১৪ হাজার স্থানে কৃষি যন্ত্রপাতির প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। কৃষকের প্রশিক্ষণ ও খামার যন্ত্রপাতির শুমারিও করা হচ্ছে এ প্রকল্পের মাধ্যমে। আধুনিক দেশীয় কৃষিযন্ত্র সম্প্রসারণ ও সহজলভ্য করার মাধ্যমে সময়মতো চাষাবাদ, উপকরণের যথাযথ ব্যবহার এবং ন্যূনতম সময়ে কম অপচয়ে শস্য আহরণের ক্ষেত্রে প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। জানা গেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির অন্যতম সংযোজনের একটি হচ্ছে কম্বাইন্ড হার্ভেস্টার। এ প্রযুক্তির মাধ্যমে ফসল কাটা, খোসা থেকে দানা আলাদা করা যায়। ছোট আকৃতির ধানি জমি চাষেও রয়েছে এর ব্যবহার। এছাড়া বীজ বপন, সার প্রয়োগ ও কীটনাশক ছিটানোর জন্যও রয়েছে ব্রডকাস্ট সিডার। নির্দিষ্ট অবস্থানে বীজ বপনের জন্য আছে সিডড্রিল। জমির মাটি সমান করার জন্য ল্যান্ড লেভেলার, এক যন্ত্র দিয়ে একইসঙ্গে চাষ ও বেড তৈরি এবং বীজ বপন করা যন্ত্র বেড প্লান্টার, আলু গ্রেডিং যন্ত্র, গবাদিপশুর জন্য খড় কাটার যন্ত্র, নন-টিপিং ট্রেইলর, টিপিং ট্রেইলর, ওয়াটার ট্যাঙ্ক, অয়েল ট্যাঙ্ক, আলু বপন যন্ত্র, গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ যন্ত্র, নিড়ানি যন্ত্র, ফুড পাম্প। জমির শক্ত মাটি কর্ষণের জন্য যন্ত্র, ধান কিংবা অন্যান্য ফসলি বীজ শুকানোর জন্যও ব্যবহার করা হচ্ছে ড্রায়ার যন্ত্র। ধান, গম, ভুট্টা শুকাতেও ব্যাচ ড্রায়ার নামক প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) চেয়ারম্যান নাসিরুজ্জামান বলেন, ২০৩০ সালে দেশে খাদ্যশস্যের চাহিদা হবে প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি টন। বিপুল এ খাদ্যশস্যের চাহিদা মেটাতে স্বল্প জমিতে বেশি ফলন জরুরি। তবে ধান, গম ও ভুট্টা জাতীয় খাদ্যশস্যে বিশ্বের গড় উৎপাদনকে এরই মধ্যে অতিক্রম করেছে বাংলাদেশ। বর্তমানে বিশ্বে প্রতি হেক্টর জমিতে গড় উৎপাদন প্রায় চার টন আর বাংলাদেশে তা ৪ দশমিক ১৫ টন। এক্ষেত্রে বাড়তি খাদ্যশস্য উৎপাদনে সহায়ক হিসেবে কাজ করছে কৃষিকাজ যান্ত্রিকীকরণ। তিনি বলেন, প্রযুক্তির পাশপাশি নতুন নতুন উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবিত হয়েছে।

একটি মন্তব্য করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন
আপনার নাম লিখুন