বারবেলা পত্রিকা্ ডেস্ক:

ঋণের নামে ও বিভিন্ন কারসাজি করে আওয়ামী লীগের সমর্থক, মদদপুষ্ট ও নেতাকর্মীরা গত নয় বছরে প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা লুট করেছে বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি। দলটি জানিয়েছে- সুশাসন আর জবাবদিহিতার অভাব, দুর্নীতি, লুটপাট, নীতিহীনতা আর বিশৃংখলার কারণে নৈরাজ্যকর অবস্থায় রয়েছে বর্তমান ব্যাংক খাত। এসব কারণে দেশের অধিকাংশ সরকারি বেসরকারি ব্যাংক ও ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের মুখে পতিত হয়েছে। ব্যাংকিং খাতের এই দূরাবস্থার জন্য সরকার দায়ী। বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে  বৃহস্পতিবার দেশের ব্যাংকিং খাত নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ অভিযোগ করেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

তিনি দাবি করেন, বর্তমানে ব্যাংকগুলো তীব্র তারল্য সংকটে জর্জরিত। দেশের বেশিরভাগ ব্যাংক এখন ধার-দেনা করে চলছে। সরকারি ব্যাংকগুলোও তাদের মূলধনের অনেকাংশই লুটে নিয়েছে। আমানতকারীরা চেক দিয়েও সময়মত টাকা পাচ্ছে না। তহবিলের অভাবে চেক বাউন্স হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের ঋণের অর্থ সময়মত ছাড় করতে পারছে না অনেক ব্যাংক। অনেক ক্ষেত্রে অনুমোদনপ্রাপ্ত ঋণও ফেরত নেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন ব্যাংকে এফডিআর ভাঙানোর হিড়িক পড়েছে।

তিনি বলেন, ব্যাংকগুলোকে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ও পরিবারতন্ত্র বেড়ে গেছে। বেড়েছে মুদ্রা পাচার ও ঋণ খেলাপির মাত্রা। এতে প্রথম সারির অর্থনীতিবিদরা অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত মনে করছেন। বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে যে রক্তক্ষরণ হচ্ছে তা অচিরেই অর্থনীতিকে রক্তশূণ্য করে ফেলবে।

মির্জা ফখরুল বলেন, সাম্প্রতিক আতংক বেসরকারি খাতের ফারমার্স ব্যাংক কেলেঙ্কারির ঘটনা থেকে শুরু হলেও প্রকৃতপক্ষে বড় ধরনের ব্যাংক কেলেঙ্কারির শুরুটা হয় ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সোনালী ব্যাংকের ‘হলমার্ক গ্রুপ কেলেঙ্কারি থেকে। বিভিন্ন অপকৌশলে ৬৫ হাজার কোটি টাকা বের করে নেওয়া হয়েছে। ২০১৭ সালের জুন শেষে সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকে মন্দ-ঋণ বেড়ে হয়েছে ৬১ হাজার ৬০২ কোটি টাকা। এসময়ে অবলোপন করা হয়েছে ৪৫ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ৮শ’ কোটি টাকা চুরি হয়েছে। অর্থাৎ লুটতরাজ আর অনিয়মের মাধ্যমে প্রায় ১ লাখ ৭২ হাজার ৪০২ কোটি টাকা ব্যাংক থেকে লুট হয়ে গেছে। ব্যাংক লুটেরাদের কারও বিরুদ্ধে কোনো ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে জনগণের করের টাকা থেকে সরকারি ব্যাংকগুলোকে ১৪ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। অনেকের মতে, ৪৫ হাজার কোটি টাকা অবলোপন করা হয়েছে বলে যে তথ্য প্রকাশ হয়েছে তা সঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে এর পরিমাণ দেড় থেকে দুই লাখ কোটি টাকার কম নয়। তিনি বলেন, অধ্যাপক আবুল বারকাত জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায় নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে একক গ্রাহকের মালিকানাধীন এননটেপে ২২টি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ দিয়েছে। শেখ আব্দুল হাই বাচ্চু বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায় ব্যাংকটি দেউলিয়ার পর্যায়ে চলে যায়।

ঋণ খেলাপির বিষয়টি তুলে ধরে তিনি অভিযোগ করে বলেন. খেলাপি ঋণই বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের সংকটের মূল কারণ। খেলাপি ঋণের পরিমাণের দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান প্রথম সারিতে। ঋণের নামে গ্রাহকদের হাজার হাজার কোটি টাকার আমানত লুটে নিচ্ছে খেলাপিরা। ‘অবলোপন’ এর দোহাই দিয়ে ঋণের তালিকা থেকে মুছে ফেলা হচ্ছে খেলাপিদের।

তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতের দুর্নীতি ও বিপর্যয়ের জন্য আওয়ামী লীগ সরকারই দায়ী। অর্থ-মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বমূলক ভূমিকায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। আর্থিক খাতে সুশাসন না থাকার ফলে ব্যাংক লুটেরারা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় আওয়ামী আশির্বাদপুষ্ট মহল আরও উৎসাহিত হয়ে নানা কৌশলে ব্যাংকের অর্থ লুন্ঠন করেই যাচ্ছে।

মির্জা ফখরুল অভিযোগ করে বলেন, ঋণ কেলেঙ্কারিসহ ব্যাংক খাতের লোপাটের সংবাদ প্রকাশ বন্ধ করতে ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) সল্ফপ্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইনফরমেশন অ্যাক্টের আওতায় একটি প্রতিষ্ঠান গঠনের প্রস্তাব করে। সরকারও বিএবি’র প্রস্তাব গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে। অথচ ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাটের তথ্য গণমাধ্যমের কল্যাণেই মানুষ জানতে পারছে। এই প্রস্তাবনা মূলত সংবাদমাধ্যমের টুটি চেপে ধরার প্রচেষ্টা ছাড়া আর কিছুই না। এটি হবে দুর্নীতিবাজদের সরাসরি প্রশ্রয় ও সুরক্ষা দেওয়া। এর মাধ্যমে ব্যাংক সেক্টরের দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করা হবে।

তিনি বলেন, দেশের ব্যাংকগুলো থেকে এই লুটপাটে সরকারের কোন মাথা ব্যাথা নেই। কারণ ভোটারবিহীন সরকারের জনগণের নিকট কোনও দায়ববদ্ধতা নেই। কিন্তু গণবিরোধী অর্থনীতি বিধ্বংসী কর্মকাণ্ড জনগণ কখনও ক্ষমা করবে না। সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিষ্টার মওদুদ আহমদ, ড. আব্দুল মঈন খান ও আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।সূত্র:সমকাল

একটি মন্তব্য করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন
আপনার নাম লিখুন