হোছাইন আহমাদ আযমী :

কুরআন শরীফে যাকাতের খাত নির্ধারিত করে দেয়া আছে। এখাত ছাড়া অন্য কোথাও যাকাত আদায় করা জায়েয নেই।
ইরশাদ হচ্ছে ঃ যাকাত তো কেবল নিঃস্ব, অভাবগ্রস্থ, ও যাকাতের কাজে নিযুক্ত ব্যক্তিদের জন্য। দাস মুক্তির জন্য,ঋণগ্রস্থদের জন্য, আল্লাহর পথের মুজাহিদ ও মুসাফিরের জন্য (সুরা তাওবা-৬০)।
এমন কোন প্রতিষ্ঠান যদি থেকে থাকে যেখানে গরীব, এতিম ছাত্র-ছাত্রীদের লালন-পালন ও ধর্মীয় শিক্ষা প্রদান করা হয়ে থাকে এবং তাদের জন্য লিল্লাহ বোডিং এর ব্যবস্থা থেকে থাকে তাহলে এমন প্রতিষ্ঠানে যাকাত, ফিতরা ও মান্নতের টাকা প্রদান করা দ্বীনের এক মহান দায়িত্ব পালনের নামান্তর হবে। দ্বীনী ইলম শিক্ষাগ্রহনকারী এবং শিক্ষাদানকারী যদি যাকাতের উপযক্ত হয় তাহলে এরূপ লোককে যাকাত দেয়া সবচেয়ে উত্তম (জাওয়াহেরে ফতুয়া)।
১। যে দরিদ্র ব্যক্তির কাছে অতি সামান্য মাল আছে, অথবা কিছুই নেই, এমনকি একদিনের খোরাকীও নেই, এমন লোক শরীয়তের দৃষ্টিতে গরীব। তাকে যাকাত দেয়া যাবে।
২। যার কাছে নিসাব পরিমান সম্পদ আছে, সে শরীয়তের দৃষ্টিতে ধনী। তাকে যাকাত দেয়া যাবেনা।
৩। অনুরুপভাবে যার কাছে যাকাতযোগ্য সম্পদ নিসাব পরিমান নেই কিন্তু অন্যধরনের সম্পদ যাতে যাকাত আসেনা যেমন ঘরের আসবাবপত্র, পরিধেয় বস্ত্র, জুতা, গার্হস্থ সামগ্রী ইত্যাদি প্রয়োজন অতিরিক্ত এবং নিসাব পরিমান আছে তাকেও যাকাত দেয়া যাবে না। আর যদি অতিরিক্ত সামগ্রী মিলেও নিসাব পরিমান না হয় তাহলে তাকে যাকাত দেয়া যাবে। (মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক হাদীস,৭১৫৬)
৪। যে ব্যক্তি এমন ঋণ গ্রস্থ, যে ঋণ পরিশোধ করার পর তার কাছে নেসাব পরিমান সম্পদ থাকেনা, তাকে যাকাত দেয়া যাবে।
৫। কোন ব্যক্তি নিজ বাড়িতে নিসাব পরিমান সম্পদের অধিকারী, কিন্তু সফরে এসে অভাবে পড়ে গেছে বা মাল সামান চুরি হয়ে গেছে এমন ব্যক্তিকে যাকাত দেয়া যাবে। তবে এ ব্যক্তির জন্য শুধু প্রয়োজন পরিমান গ্রহন করা যায়েজ, এর বেশি নয়।
৬। যাকাতের টাকা এমন দরিদ্রকে দেয়া উত্তম যে দ্বীনদার। দ্বীনদার নয় এমন ব্যক্তি যদি যাকাতের উপযুক্ত হয়, তাহলে তাকেও যাকাত দেয়া যাবে। কিন্তু যদি প্রবল ধারনা হয় যে, তাকে যাকাত দিলে সে গুনাহের কাজে ব্যবহার করবে তাহলে তাকে যাকাত দেয়া জায়েয নেই।
৭। যাকাত শুধু মুসলমানদেরকেই দেয়া যাবে। হিন্দু, খ্রীষ্টান, বৌদ্ধ বা অন্যকোন অমুসলিমকে যাকাত দেয়া জায়েজ নেই। তবে নফল দান খায়রাত অমুসলিমদেরকেও করা যায়। (মুসান্নাফে আবী শায়বা হাদীস, ৬/৫১৬-৫১৭)
৭। যাকাতের টাকা যাকাতের হকদারদের নিকট পৌছে দিতে হবে। যাকাতের নির্ধারিত খাতে ব্যয় না করে অন্যকোন জনকল্যাণ মূলক কাজে ব্যয় করা হলে যাকাত আদায় হবেনা। যেমন রাস্তা-ঘাট, পুল নির্মাণ, কুপ খনন, বিদ্যুৎ- পানি ইত্যাদির ব্যবস্থা করা।
৮। যাকাতের টাকা দ্বারা মসজিদ মাদরাসা নির্মাণ করা, ইসলাম প্রচার করা, ইমাম-মোয়াজ্জিনের বেতন ভাতা দেয়া, ওয়াজ মাহফিল করা, ধর্মীয় বই-পুস্তক ছাপানো, ইসলামী মিডিয়া তথা রেডিও, টিভির চ্যানেল করা ইত্যাদিও জায়েয নয়। মোটকথা যাকাতের টাকা এর হকদারকেই (ব্যক্তি) দিতে হবে। অন্যকোন ভাল কাজে ব্যয় করলেও যাকাত আদায় হবেনা। (মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক হাদীস, ৬৯৪৭-৪৮)
৯। যাকাত আদায় হওয়ার জন্য শর্ত হলো ; উপযুক্ত ব্যক্তিকে মালিক বানিয়ে দেয়া। যাতে সে নিজের খুশি মত তার প্রয়োজন পূরণ করতে পারে। এরূপ না করে যদি দাতা নিজের খুশি মত দরিদ্র লোকটির প্রয়োজনে যাকাতের টাকাটি খরচ করে তাহলে যাকাত আদায় হবেনা। (রদ্দুল মুহতার ২/২৫৭)
নিয়ম হল যাকতের টাকা দরিদ্র ব্যক্তির মালিকানায় দিয়ে দেয়া। এরপর যদি সে নিজের খুশিমত এসব কাজেই ব্যয় করে তাহলেও যাকাতদাতার যাকাত আদায় হয়ে যাবে।
১০। আত্বীয়-স্বজন যদি যাকাত গ্রহনের উপযুক্ত হয় তাহলে তাদেরকেই যাকাত দেয়া উত্তম। ভাই, বোন, ভাতিজা, ভাগিনা, চাচা, মামা, ফুফু, খালা, এবং অন্যান্য আত্বিয়দের যাকাত দেয়া যাবে। (মুসান্নাফে আবী শায়বা হাদীস, ৬/৫৪২-৫৪৬) দেয়ার সময় যাকাতের উল্লেখ যা করে মনে মনে যাকাতের নিয়ত করলেও চলবে। এ ধরনের ক্ষেত্রে এটাই উত্তম।
১১। নিজ পিতা-মাতা, দাদা-দাদী, নানা-নানী, পরদাদা,প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ যারা জন্মের উৎস তাদেরকে যাকাত দেয়া জায়েয নয়। এমনিভাবে নিজের ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতিন, এবং তাদের অধস্তনকে নিজ সম্পদের যাকাত দেয়া জায়েয নয়। স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে যাকাত দেয়া জায়েয নয়। (রদ্দুল মুহতার ২/২৫৮)
১২। বাড়ির কাজের ছেলে বা কাজের মেয়েকে যাকাত দেয়া জায়েয যদি তারা যাকাত গ্রহনের উপযুক্ত হয়। তবে কাজের পারিশ্রমিক হিসেবে যাকাত দিলে যাকাত আদায় হবে না। কেউ কেউ কাজের লোক রাখার সময় বলে মাসে এত টাকা পাবে আর ঈদে বড় একটা অংক পাবে। এক্ষেত্রে ঈদের সময় দেয়া টাকা যাকাত হিসেবে প্রদান করা যাবেনা । সেটা তার পারিশ্রমিকের অংশ বলেই গন্য হবে।
১৩। কোন লোককে যাকাতের উপযুক্ত মনে হওয়ায় তাকে যাকাত দেয়া হল, কিন্তু পরবর্তিতে প্রকাশ পেল যে, সে নিসাব পরিমান সম্পদের মালিক তাহলেও যাকাত আদায় হয়ে যাবে। পুনরায় যাকাত দিতে হবেনা। তবে যাকে যাকাত দেয়া হয়েছে সে যদি এটা জানতে পারে এটা যাকাতের টাকা ছিল সেক্ষেত্রে তার উপর তা ফেরত দেয় ওয়াজিব।
১৪। যাকাত দেয়ার পর যদি জানা যায় যে, যাকাত গ্রহীতা অমুসলিম ছিল তাহলে যাকাত আদায় হবেনা। পুনরায় যাকাত দিতে হবে।
১৫। অপ্রাপ্ত বয়স্ক (বুঝমান) ছেলে-মেয়েকে যাকাত দেয়া যায়। (রদ্দল মুহতার ২/২৫৭; আল-বাহরুর রায়েক ২/২০১)

যাকাত বা ফিতরা দ্বারা দারিদ্র বিমোচনের উদ্দেশ্যে সামাজিক ভাবে কাউকে বা নির্দিষ্ট টার্গেট করে কয়েকজন করে পর্যায়ক্রমে কোন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেয়া যেতে পারে। এ ব্যপারে সার্বিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ত্বও বটে। যেমন কোন গরীব, অসহায় ব্যক্তিকে গরু অথবা একটি বকরি অথবা অথবা একটি রিকসা অথবা একটি ভ্যান গাড়ি ইত্যাদি কিনে দেয়া যেতে পারে। যাতে করে ঐ দরিদ্র ব্যক্তিটি দারিদ্রতার করাল গ্রাস মুক্ত হয়ে সচ্ছলতার মুখ দেখতে পারে।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজের এসোসিয়েট প্রফেসর (মেডিসিন) ডা. মো. আজিজুল হক তার রচনাতে লিখেছেন, প্রকৃত হকদারদেরকে স্বাধিনভাবে টাকা খরচ করার সুযোগ দিতে হবে। যেমন- নিজের বাচ্চাকে দামী দামী খেলনা কিনে দিচ্ছেন কিন্তু কোন গরিব ব্যক্তি যদি তার বাচ্চাকে যাকাতের টাকা দিয়ে ছোট খাট কোন খেলনা কিনে দেয় তাতে ইর্ষান্বিত হওয়ার কিছু নেই। কারণ মানুষ হিসেবে একজন গরীব মানুষের সন্তানের প্রতি আবেগ অনুভুতি ও আপনার নিজের সন্তানের প্রতি আবেগ অনুভুতি একই সমান। এই বিষয়টাকেও শ্রদ্ধা দেখানো ইসলামের শিক্ষা।

একটি মন্তব্য করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন
আপনার নাম লিখুন