ঈদুল ফিতর : সম্প্রীতি ও মেলবন্ধনের আবাহন

0
245

হকদার খুঁজে খুঁজে জাকাত দিন। বৈষম্যমুক্ত একটি মানবিক সমাজ গড়তে জাকাতের বিধানকে ফলপ্রসূ করে তুলুন। এবং দেশ ও বিশ্বে অর্থনৈতিক সাম্য ও ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে জাকাতের বিধান দিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ পাক। যথাযথভাবে জাকাত বণ্টনের মাধ্যমে আমরা মহান আল্লাহ পাকের অনুগ্রহসিক্ত ও করুণাধন্য হতে পারি। এবারের ঈদুল ফিতর আমাদের প্রিয় স্বদেশে বিভেদ বিবাদ বিভাজনের পরিবর্তে শান্তির বাতাবরণ তৈরি হোক এই চাওয়া আমাদের।

মাসব্যাপী সিয়াম সাধনা শেষে বহু প্রতীক্ষিত ঈদুল ফিতর এখন দোরগোড়ায়। হিজরি সনের দশম মাস শাওয়ালের চাঁদ আজ সন্ধ্যায় আকাশে দেখা গেলেই আগামীকাল শনিবার সারা দেশে পালিত হবে ঈদুল ফিতর। আর রমজান মাস যদি ত্রিশটি পূর্ণ হয় তাহলে আগামীকাল শনিবারের পরিবর্তে রবিবার নিশ্চিতভাবে ঈদুল ফিতর পালিত হবে। ছেলে-বুড়ো, নারী-পুরুষ আবালবৃদ্ধবনিতা সবার মাঝে ঈদের আনন্দধারা বইয়ে যাবে। বাঁধভাঙা ঈদের খুশি ও উৎসবের জোয়ার আরো আগে থেকেই বইছে। শহুরের কর্মব্যস্ত মানুষ পরিবারের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে দুর্ভোগ মাড়িয়ে নাড়ির টানে ছুটছে ট্রেন, বাস, লঞ্চ ও নানা পরিবহনে। রেলের একটি টিকেট জোগাড় করতে রেল স্টেশনে রাতভর কাটিয়ে দেয়া মানুষের সংখ্যা অনেক। দীর্ঘ ভোগান্তি-কষ্ট মুহূর্তেই উবে যায় টিকেটরূপী সোনার হরিণটি হাতে পেলে।

ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানে অনাবিল আনন্দ খুশিতে গা ভাসিয়ে দেয়া। ঈদের নতুন চাঁদ দেখার আনন্দের যেন তুলনাই হয় না। ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’- কবি কাজী নজরুলের জননন্দিত এই ঈদুল ফিতরের গানটি যখন চাঁদ রাতে সব চ্যানেলে ও রেডিওতে একযোগে প্রচারিত হয়, তখন ঈদের আনন্দ যেন ষোলকলায় পূর্ণ হয়। ঈদের সারবর্তা ও ঈদের অন্তর্নিহিত সাম্যের দর্শন নজরুলের এই একটি গানে চুম্বকভাবে ধরা দেয়। সুরে, আহ্বানে, সাম্যে ও সম্প্র্রীতির ডাকে ঋদ্ধ নজরুলের এই ঈদ বন্দনার তুলনাই চলে না।

ধনী-গরিব, উঁচু-নিচু সর্বস্তরের মানুষ একসঙ্গে মসজিদে ও ঈদগাহে গিয়ে নামাজ পড়েন। তখন সবাই থাকেন খোশ মেজাজে। ধনীর পোশাক একটু দামি হলেও গরিব পরিবারের ছেলেমেয়েরাও আবার নতুন কাপড়ের ঘ্রাণে মেতে থাকে। কেউ আবার ঈদে নতুন কাপড়ও জোগাড় করতে পারে না। আর্থিক দৈন্যের কারণে যাদের মাঝে ঈদের আনন্দ আসেনি এই অসহায় অবুঝ শিশুদের প্রতি সহানুভ‚তিপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাতে হবে আশপাশের বিত্তবানদের। এই গরিব ছেলেমেয়েদেরও ঈদের নতুন জামা কাপড় কিনে দিতে হবে প্রতিবেশী ধনীদের। ইসলামি নির্দেশনাই হচ্ছে প্রতিবেশীর প্রয়োজন-চাহিদা পূরণ করা। প্রতিবেশী যদি আর্থিক দৈন্যে ও দুরবস্থায় অসহায়ত্বের মাঝে দিন কাটায় তবে প্রতিবেশী বিত্তবানদের পরকালে আল্লাহর দরবারে নিশ্চিতভাবে জবাবদিহি করতে হবে। প্রতিবেশীর হক না দেয়ায় আল্লাহ পাকের নির্ধারিত শাস্তির মুখোমুুখি হতে হবে বিত্তবানদের। তাই এই ঈদে আপনার চারপাশের অভাবী অসহায় মানুষগুলোর দিকে একটু নজর দিন। তাদের মুখে হাসি ফোটাতে আপনিও দানের হাত প্রসারিত করুন। কেননা, হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে- ‘ইরহামু মান ফিল আরদি ওয়া ইয়ারহামুকুম মান ফিস সামা’ অর্থাৎ জমিনে যারা আছে তাদের প্রতি দয়া কর। আসমানে যিনি আছেন তিনিও তোমাদের প্রতি দয়া করবেন। (আবু দাউদ, তিরমিজি)। মানুষের প্রতি কর্তব্যনিষ্ঠ হওয়ার নির্দেশনা রয়েছে প্রিয় নবীর (দ.) এই বাণীতে।

ঈদুল ফিতরের দিন করণীয় : নামাজের আগে গোসল করা, মিসওয়াক করা, সুগন্ধি ব্যবহার করা, সামর্থ্য অনুযায়ী উত্তম পোশাকের ব্যবস্থা করা ও পরিধান করা, সকাল সকাল ঈদের মাঠে যাওয়া। ঈদগাহে যাওয়ার আগেই সদকায়ে ফিতর আদায় করা। ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বে মিষ্টি জাতীয় খাবার গ্রহণ করা। ঈদগাহে একপথ দিয়ে পায়ে হেঁটে যাওয়া ও অন্য পথ দিয়ে আসা। ঈদগাহে আসা-যাওয়ার পথে নিম্নের তকবিরটি ধীরে ধীরে পড়া উত্তম। ‘ আল্লাহু আকবর আল্লাহু আকবর লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াল্লাহু আকবর আল্লাহু আকবর ওয়ালিল্লাহিল হামদ’।

মাহে রমজানে রোজার ভুল-বিচ্যুতির কাফফারা হিসেবে সদকায়ে ফিতর দিতে হয়। ‘ফিতর’ অর্থ রোজা খোলা বা ভঙ্গ করা। হাদিস শরিফে একে জাকাতুল ফিতর বলে উল্লেখ আছে। জাকাতুল ফিতর ব্যক্তির দিকে আর জাকাত সম্পদের দিকে প্রত্যাবর্তন করে। জাকাত যেভাবে সম্পদকে পবিত্র করে, তেমনি জাকাতুল ফিতর ব্যক্তিকে পবিত্র করে। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত, ‘প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাকাতুল ফিতরকে রোজাদারের বেহুদা কথা ও কাজের প্রতিবিধান হিসেবে এবং গুনাহ থেকে পবিত্র করা এবং নিস্ব অভাবী অসহায় গরিব-মিসকিনদের খাবার জোগানের উদ্দেশে এই বিধান আবশ্যকীয় করেছেন। যে ব্যক্তি তা ঈদের নামাজের আগে আদায় করে সেটি আল্লাহ পাকের কাছে কবুল হয়। আর যে ব্যক্তি তা ঈদের নামাজের পর আদায় করে তা অন্যান্য দান সদকার মতো বিবেচিত হবে। (আবু দাউদ, ইবনে মাজা, হাকেম)

ঈদুল ফিতরের নামাজের আগেই সদকায়ে ফিতর আদায় করতে হয়। এটি ওয়াজিব বা অবশ্য পালনীয়। গ্রহণযোগ্য কোনো কারণে ঈদের নামাজের আগে ফিতরা দিতে না পারলে তা পরে আদায় করতে হবে। ঈদুল ফিতরের দিন সুবহে সাদিকের সময় জীবিকা নির্বাহের আবশ্যকীয় সামগ্রী ছাড়া নিসাব পরিমাণ টাকা বা সম্পদের অধিকারী হলেই প্রত্যেক সচ্ছল নারী-পুরুষ, নাবালক-সাবালক সবার ওপর সদকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব। জনপ্রতি পৌনে দুই সের গম বা সমতুল্য টাকা ফিতরা হিসেবে গরিব-মিসকিনকে দিতে হবে। চাল বা অন্য কোনো সামগ্রী দিতে চাইলেও ওই পরিমাণ গমের মূল্যের সমান হতে হবে। সরকারের ইসলামিক ফাউন্ডেশনের শরিয়া বোর্ড এবারের ফিতরার হার নির্ধারণ করেছে সর্বনিম্ন ৭০ টাকা। তবে চাইলে এর চেয়ে বেশি টাকা দেয়া যাবে। যাদের জাকাত দেয়া যায় তাদের ফিতরা দিতে কোনো বাধা নেই। ফিতরা পাওয়ার তারাই বেশি হকদার যারা নিকটাত্মীয় ও মুসলিম প্রতিবেশী। জাকাত-ফিতরাসহ যে কোনো দান গোপন রাখাই শ্রেয়। আত্মীয় স্বজনকে একথা বলার দরকার নেই যে, এই টাকা ফিতরা বা জাকাতের টাকা। অন্তরে নিয়ত থাকাই যথেষ্ট।

গরিব মানুষ যাতে স্বচ্ছন্দ্যে সচ্ছলভাবে জীবন যাপন করতে পারেন এজন্যই আল্লাহ পাক ধনীদের ওপর জাকাত দেয়া ফরজ করেছেন। প্রকৃতপক্ষে সম্পদের মালিক তো আল্লাহ পাক। তিনি যাকে ইচ্ছা সম্পদ দান করেন আর যাকে ইচ্ছা দান করেন না। যাকে এ সম্পদ দান করা হয় তার জন্য এটি আমানত স্বরূপ। আর এ আমানতের শোকর আদায় হলো সম্পদের প্রকৃত মালিকের মর্জি মোতাবেক খরচ করা। আল্লাহ পাক কুরান মজিদের সূরা বাকারার ২৭২ নম্বর আয়াতে ইরশাদ করেন ‘মা তুনফিকুনা ইল্লাবতিগাআ ওয়াজহিল্লাহ’- অর্থাৎ তোমাদের ধন সম্পদ একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ব্যয় করো।’ আর যে ব্যক্তি আল্লাহর নেয়ামত তথা ধন সম্পদ প্রাপ্তিতে শোকর আদায় করবে তাকে আল্লাহ পাক সম্পদ বৃদ্ধি করে দেবেন। ‘লায়িন শাকারতুম লাআজিদান্নাকুম’- যদি তোমরা শোকর আদায় কর, আমি তোমাদের অধিক পুরস্কার দান করব। (সুরা ইবরাহিম : ৭)।

জাকাতের মতো অর্থনৈতিক বিধান দিয়ে আল্লাহ পাক ঈমানদারদের কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন করেন। যিনি আল্লাহর হুকুম মেনে নিজের প্রয়োজনাতিরিক্ত ধন সম্পদ থেকে জাকাত আদায় করেন তিনি প্রকৃত ঈমানের পরিচয় দিয়ে থাকেন। জাকাত যিনি দেন না, আল্লাহর হুকুমই যেন অমান্য করা হলো। নামাজ-রোজা-তাসবিহ তাহলিল ইত্যাদি দৈহিক ইবাদতে নিজেকে যতই নিয়োজিত রাখুক না কেন, জাকাত না দিলে ওই ব্যক্তির নামাজও কবুল হবে না। এ প্রসঙ্গে হাদিসে পাকে রয়েছে, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মসউদ (রা.) বলেন, ‘তোমাদের নামাজ কায়েম ও জাকাত আদায় করার জন্য আদেশ দেয়া হয়েছে। কেউ জাকাত না দিলে তার নামাজও কবুল হবে না।’ (তাফসিরে তাবারি, ১৪ : ১৫৩ পৃ.)।

জাকাত আদায়ে সম্পদ কমে না বরং বৃদ্ধি পায়। আল্লাহর বাণী- ‘আর আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তোমরা যে জাকাত দাও, মূলত এ জাকাত দানকারীরাই তাদের অর্থ বৃদ্ধি করে (সুরা আররুম : ৩-৯)। অন্যদিকে জাকাত আদায় না করলে দুনিয়া-আখিরাতে কঠিন শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে বলে আল্লাহ পাক হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। ‘যারা স্বর্ণ এবং রৌপ্য সঞ্চয় করে রাখে এবং তা আল্লাহর পথে খরচ করে না,তাদের কঠিন শাস্তির সুসংবাদ দাও।’ (সুরা তওবা : ৩৪)।

ইসলাম মানবতার ধর্ম, মানবতার সেবা ও অর্থনৈতিক মুক্তির জন্যই জাকাতের বিধান ফরজ করেছেন আল্লাহ পাক। সম্পদ যাতে কতিপয় লোকের মাঝে কুক্ষিগত না থাকে এজন্যই জাকাতের বিধান দেয়া হয়েছে। আল্লাহর বাণী- ‘তোমাদের মধ্যকার গুটিকয়েকের নিকট যেন সম্পদ কুক্ষিগত না থাকে’ (সুরা হাশর : ৭)। তাই ধনীরা হিসাব করে হকদার খুঁজে খুঁজে জাকাত দিন। বৈষম্যমুক্ত একটি মানবিক সমাজ গড়তে জাকাতের বিধানকে ফলপ্রসূ করে তুলুন। এবং দেশ ও বিশে^ অর্থনৈতিক সাম্য ও ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে জাকাতের বিধান দিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ পাক। যথাযথভাবে জাকাত বণ্টনের মাধ্যমে আমরা মহান আল্লাহ পাকের অনুগ্রহসিক্ত ও করুণাধন্য হতে পারি। এবারের ঈদুল ফিতর আমাদের প্রিয় স্বদেশে বিভেদ বিবাদ বিভাজনের পরিবর্তে শান্তির বাতাবরণ তৈরি হোক এই চাওয়া আমাদের। এবং সেই সঙ্গে সমগ্র বিশে^ জননিরাপত্তা ফিরে আসুক, অশান্তি, হানাহানি, যুদ্ধ-সংঘাতমুক্ত একটি মানবিক স¤প্রীতিপূর্ণ পরিবেশ ফিরে আসুক এই আমাদের প্রত্যাশা। আমার আপনার কারো লোভ-জিঘাংসা-লিপ্সায় ঈদের আনন্দ যেন ফিকে হয়ে না যায় সেদিকেও বিশেষ নজর রাখা চাই। ঈদের কোলাকুলিতে বুকে বুক টেনে আনার মাধ্যমে পারস্পরিক ঐক্য সম্প্রীতি ও মেলবন্ধন আরো বেশি হোক জোরালো। সবাইকে ঈদুল ফিতরের ফুলেল শুভেচ্ছা। ঈদের আনন্দ সবাইকে স্পর্শ করুক- এই আমাদের মিনতি ও ফরিয়াদ।

একটি মন্তব্য করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন
আপনার নাম লিখুন